IT Support
৭ জুলাই ২০২৬, ৭:৩৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ভারী বর্ষণ ও পাহাড় ধসে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার

প্রকৃতির বিরূপ আবহাওয়া চরম ভোগান্তিতে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দুই জেলা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত কয়েকদিন ধরে চলা অবিরাম ও অতি ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এই অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত। কক্সবাজারের ৯টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন এখন পানির নিচে। মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও টেকনাফের বিস্তীর্ণ এলাকার লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
এদিকে গত দুই দিনে কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরেও সদরের ঝিলংজায় পাহাড়ধসে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে রেললাইনে পানি জমে থাকায় প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রামে আটকে পড়েছে কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইটের অবতরণ ব্যর্থ হয়েছে এবং ঝড়ের কারণে কাপ্তাই ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়ক যোগাযোগ কয়েক ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন ছিল। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এই অতি ভারী বর্ষণ আগামী আরও দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
টানা বর্ষণের কারণে কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা অঞ্চলগুলোতে প্রতিনিয়ত ট্র্যাজেডি নেমে আসছে। আজ মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের দরিয়ানগর বড়ছড়া এলাকায় ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে থাকা নাসিমা আক্তার (২৭) নামের এক গৃহবধূ মাটিচাপা পড়ে নিহত হন। এই ঘটনায় তার স্বামী জসিম উদ্দিন ও এক সন্তান গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর আগে গতকাল রোববার দিবাগত রাতে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসে ১০ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে আটজনই ছিলেন রোহিঙ্গা শরণার্থী। এইদিকে পেকুয়ায় মাটির ঘর ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে দুই দিনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ জনে।
অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়া ও বঙ্গোপসাগর চরম উত্তাল থাকায় টেকনাফের সঙ্গে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সব ধরনের নৌযান চলাচল টানা পাঁচ দিন ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন দ্বীপের বাসিন্দারা। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় দ্বীপে দ্রুত খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকটের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই বৈরী পরিস্থিতির কারণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী গতকাল টেকনাফে এসে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। জেলা প্রশাসন তাদের পুনরায় পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জরুরি আবেদন পাঠিয়েছে এবং পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য কোস্টগার্ডের বিশেষ সহযোগিতা চেয়েছে।
এদিকে বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইব্রাহীম খলিল জানান, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর এলাকায় ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। আবুধাবি থেকে আসা ইউএস-বাংলা এবং শারজাহ থেকে আসা এয়ার অ্যারাবিয়ার দুটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এবং ঢাকা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামতে না পেরে ঢাকায় জরুরি অবতরণ করে।
এছাড় রেললাইনের ওপর বন্যার পানি জমে থাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর স্টেশনে আটকে রয়েছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে জানালীহাট স্টেশনের কাছে রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে গেলে ট্রেনটি থামিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেনটিকে পিছিয়ে ষোলশহর স্টেশনে এনে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের বালুচরা এলাকায় আজ সকালে পাহাড়ধস এবং একটি বিশাল গাছ উপড়ে পড়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে মাটি ও গাছ অপসারণ করলে বিকেল ৩টার দিকে সড়কটি সচল হয়। কাপ্তাই উপজেলা প্রশাসন সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে পাহাড়ে বসবাসকারীদের জন্য ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে রেকর্ড ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সকালের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, হালিশহর ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন নিচু এলাকার সড়ক তলিয়ে কোমর সমান পানি হয়ে যায়।
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার জানান, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের আগেই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়েছিল। দুর্ঘটনা এড়াতে বিকেল থেকেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উচ্ছেদ ও বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার জোরালো অভিযান শুরু হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, বৃষ্টি সাময়িক কমলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলেও আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও দুই দিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। তাই পাহাড়ধসে আর কোনো প্রাণহানি যেন না ঘটে, সে জন্য প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। ইতিমধ্যে জেলাজুড়ে এক হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। উপদ্রুত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করে যাচ্ছেন।
Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিদেশি শিক্ষার্থী-সাংবাদিকদের ভিসা নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা

বাধ্যতামূলক অবসরে বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা

কলকাতার হোটেলে ভয়াবহ আগুনে ৯জন নিহত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব একমাত্র জনগণের : প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদল-শিবিরের দফায় দফায় সংঘর্ষ

মালয়েশিয়ায় সহকর্মীদের সংঘর্ষে ৩ বাংলাদেশি নিহত

কার্যকর মধ্যস্থতায় কমতে পারে ৪৫ লাখ মামলার জট: আইনমন্ত্রী

আগস্টজুড়ে টানা বৃষ্টির আভাস

প্রাথমিকে ১৪ হাজার ৩৮৪ শিক্ষকের যোগদান শুরু অক্টোবরে

মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে একমাত্র ক্ষমতা দেখাতে পারে জনগণ : তথ্যমন্ত্রী

১০

মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই : মির্জা ফখরুল

১১

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী

১২

দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

১৩

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের খবরে সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরছেন স্পিকার

১৪

স্টার্টআপের নতুন নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করবে সরকার : প্রধানমন্ত্রী

১৫

‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ

১৬

তানজিদ-সৌম্যর ঝড়ো ব্যাটিংয়ে স্বস্তির জয় বাংলাদেশের

১৭

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাসচাপায় নিহত ৫

১৮

বাংলাদেশিদের জন্য খুললো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

১৯

লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৭৪ বাংলাদেশি

২০